মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

মুক্তিযুদ্ধে কমলনগর

মুক্তিযুদ্ধে রামগতি তথা কমলনগরঃ

          মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নোয়াখালীর রামগতি তথা কমলনগর উপজেলার আমি একজন যুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার। মহান জাতির মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সনের ২৫ শে মার্চের গভীর রাতে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষনার পরপরই যখন পাক-হানাদার বাহিনী রাজধানী ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ সদর দপ্তরের ঘুমমত্ম পুলিশ বাহিনীর উপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে অসংখ্য ঘুমমত্ম পুলিশ বাহিনীর সদস্যদেরকে হত্যা করে। ঢাকার অলিতে গলিতে নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করে নিরস্ত্র নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। খবরটি ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলাদেশে। বাংলার আপামর জনগন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে পাক-হানাদার বাহিনীর বিরম্নদ্ধে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গিয়ে অনেকে আশ্রয় নেয়। সেদিন ভারত আমাদেরকে আশ্রয় দিয়ে অস্ত্র দিয়ে অর্থ দিয়ে ট্রেনিং দিয়ে সর্বাত্মক সহযোগীতা দিয়েছিল। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন হওয়ার পরপরই  বাংলাদেশের যুব সম্প্রদায় অস্ত্র ট্রেনিং নেওয়ার জন্য দলে দলে ভারতে প্রবেশ করে। আমি ও ঠিক সেই মূহর্তে অর্থ্যাৎ এপ্রিলের শেষ দিকে ৮ জনের একটি গ্রম্নপ নিয়ে পথের বহু বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করি। আমার সাথীয় ৬ জনকে উদয়পুর আমাদের তৎকালীন সংসদ সদস্য জনাব সিরাজুল ইসলাম সাহেবের আশ্রয়ে রেখে আমি আমার সাথে একজনকে নিয়ে আগরতলা তৎকালীন ডাকসুর ভিপি আজকের জাসদ নেতা জনাব আ স ম আব্দুর রব ভাইয়ের নিকট যাই। তিনি আগরতলা শ্রীধর ভিলা নামে একটি ছোট ভবনে থাকতেন। রব ভাই পরের দিন আমাকে বিমান যোগে ভারতের উত্তর প্রদেশের টেন্ডুয়া নামক সামরিক ট্রেনিং সেন্টারে পাঠিয়ে দেন। প্রায় তিন মাস ট্রেনিং শেষে আমাকে আবার উদয়পুর ট্রানজিট ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ট্রানজিট ক্যাম্প থেকে কয়েকদিনের মধ্যেই পনের জনের একটি বাহিনী অস্ত্র সস্ত্র গোলা লাবারম্নদসহ আমার নেতৃত্বে অর্থাৎ আমাকে কমান্ডারের দায়িত্ব দিয়ে ও আমার সাথের শহীদ মুসত্মাফিজুর রহমানকে ডিপুটি কমান্ডার করে দেশের ভিতরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আসার পথটা ছিল আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর ও দুর্বিসহ। প্রতি রাতে আমাদেরকে পথ চলতে হতো আর দিনের বেলায় আমাদেরকে দলীয় কোন লোকের আশ্রয়ে থাকতে হতো। এইভাবে রাতের পর রাত হেটে পথে জীবন বাজি রেখে আমাদের কে আমাদের গমত্মব্যস্থল রামগতি আসতে হয়। রামগতি এসে আমাদের আর্মি ক্যাম্প নামে আমাদের পরিচিত ক্যাম্পে অবস্থান করি। এরপর আমরা নিজেরা ভিন্ন ক্যাম্প করি। ক্যাম্পে অবস্থান করে আসেত্ম আসেত্ম এলাকার খোজ খবর পরিস্থিতি রাজাকারদের ক্যাম্প ম্যালেশিয়াদের ক্যাম্প তাদের গতিবিধি এই সব পর্যবেক্ষনকরার জন্য এলাকা থেকে আমাদের সর্ম্পকিত দলীয় কিছু লোকজনকে কাজে লাগাই। আমাদের প্রথম অপারেশন রামগতি থানা পুলিশ ষ্টেশন ও রামগতি ওয়াপদা ভবনে অবস্থানরত মিলিশিয়া ক্যাম্প । উক্ত অপারেশনটি পরামর্শক্রমে আমরা বিএলএফ  বাহিনী ও আর্মি বাহিনী যৌথভাবে পরিচালনা করি। মিলিশিয়া ক্যাম্প অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন আর্মি বাহিনীর কমান্ডার সুবেদার আবদুল লতিফ আর রামগতি থানা পুলিশ ষ্টেশন অপারেশনের দায়িত্বে ছিলাম আমি। অপারেশনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় ৩০ মিনিট। ০৫-০৭-৭১ রাত ১০ টার পরেই আমাদের অপারেশন শুরম্ন হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই পুলিশ ষ্টেশন আমাদের দখলে আসে। পুলিশ ষ্টেশন হতে ৫৬ টি রাইফেল ও বন্দুক এবং ৩০০০ বুলেট উদ্ধার করি। অতপর আমরা অপারেশন স্থান ত্যাগ করি। অস্ত্র সস্ত্রগুলা আমরা দুই ক্যাম্পে ভাগ করে নেই। এলাকা থেকে দলীয় যুবক ছেলেদেরকে সংগ্রহ করে ক্যাম্পে নিয়ে ট্রেনিং দিয়ে অস্ত্র হাতে তুলে দেই। এইভাবে আমাদের শক্তিবৃদ্ধি পেতে থাকে। ইতিমধ্যেই রামগতি থানার উত্তর অঞ্চল অর্থাৎ বর্তমান কমলনগর থানার করইতলা হাজিরহাটে দুটি রাজাকার ক্যাম্প গঠিত হয়। হাজিরহাটে একটি পাক- মিলিশিয়া ক্যাম্প গঠিত হয়। করম্ননানগরের নিকট ইসমাইল মিয়ার মাদ্রাসায় গঠিত রাজাকার ক্যাম্প ভেঙ্গে দেই। রামগতি থানার উত্তর অঞ্চল তথা কমলনগরেই রাজাকার ক্যাম্পের সংখ্যা ছিল বেশি। রাজাকার ক্যাম্প বেশি হওয়ার পেছনে আরেকটা যুক্তিও ছিল । তা হলো সাম্যবাদী দলের নেতা কমরেড মোহাম্মদ তোয়াহা সাহেবের নের্তৃত্বে এ অঞ্চলে নকশাল পন্থিদের অপতৎপরতা । উভয় শক্তিই ছিল আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরম্নদ্ধে। যেমন পাকিসত্মান ছিল আমাদের প্রকাশ্য শত্রম্ন অপরদিকে পাকিসত্মানের বন্ধু রাষ্ট্র চীন ও ছিল আমাদের স্বাধীনতার বিরম্নদ্ধে। অপরদিকে এই দুই শক্তিই আবার পরস্পর পরস্পরের শত্রম্ন। আমাদের কে কিন্তু উভয় শক্তির বিরম্নদ্ধেই লড়াই করতে হয়েছে। ১১-১০-৭১ ইং তারিখে জমিদার হাটের উত্তরে রাজাকারদের যাতায়াতের পথে আমরা অর্তকিতে তাদের উপর অপারেশন চালাই। এই অপারেশনের নের্তৃত্বে ছিলাম আমি। অপারেশনে রাজাকারদের ২২ জন মারা যায়। আমাদের একজন আহত হয়। এর পর ০৫-১২-৭১ ইং তারিখে রামগতি মিলিশিয়া ক্যাম্প অপরারেশন । সেই অপারেশন নদীর পাড়ের ওয়াপদা ভবনের অবস্থানরত মিলিশিয়াদের নদীর কূলে থাকা গানবোট যোগে পলায়নরত অবস্থায় পিছন দিক থেকে তাদের উপর আক্রমন চালানো হয়। এই অপারেশনে আহত অবস্থায় একজন পাক- মিলিশিয়াকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়। বাকীরা কিছু কিছু আহত অবস্থায় তড়িঘড়ি করে গানবোটে উঠে পালিয়ে যায়। গানবোট থেকে অবশ্য আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্যকরে সেল নিক্ষেপকরা হয়। আলস্নাহর অশেষ রহমতে আমাদের কোন লোক আহত বা মারা যায় নাই।  এই অপারেশনের নের্তৃত বদেয় রামগতি অঞ্চলের তৎকালীন ও বর্তমান কমান্ডার হাসান মাহমুদ ফেরদৌস ও সুবেদার আবদুল লতিফ। ১৪-১২-৭১ ইং তারিখ রামগতি থানা তথা কমলনগরের মুক্তিযুদ্ধের সর্বশেষ অপারেশন। এই অপারেশনটি আমি আমার ক্যাম্পের সকল মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নিয়ে হাজির হাট বাজারের চতুর্দিক ঘেরাও করে ফাকাঁগুলি ছুড়তে থাকি এবং রাজাকারদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে দেই। আমাদের সাথে সম্পর্কিত দুই তিন জনকে তাদের সাথে কথা বলার জন্য অর্থাৎ তাদেরকে আত্মসমর্পন করার জন্য পরামর্শ দিয়ে পাঠাই। আত্মসমর্পন করলে তাদের কোন ক্ষতি আমরা করবো না এ অভয় দিলে তারা আত্মসর্পন করতে রাজি হয় ও এক ঘন্টার মধ্যেই  নিজেদের মধ্যে পরামর্শক্রমে তারা আত্মসমর্পন করে। তাদের সংখ্যা ছিল ৮০ জন। এই অপারেশনের পর অর্থাৎ ১৪ ডিসেম্বর, ৭১ রামগতি থানা তথা কমলনগর শত্রম্ন মুক্ত হয় । আমরা বিজয় লাভ করি। এর পর ১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল আমরা চুড়ামত্ম বিজয় লাভ করি। এই দিন পাকিসত্মান সেনা-বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজি ৯৮ হাজার পাক-বাহিনী নিয়ে মিত্র শক্তির নিকট অর্থাৎ ভারতের সেনা প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ  জি ওসমানীর নিকট ঢাকার সরওয়ার্দী উদ্যানেলক্ষ্য লক্ষ্যলোকের সামনে আত্মসমর্পন করে। অতঃপর ১৯৭২ সনের জানুয়ারী মাসের ১০ তারিখ দিবাগত গভীর রাতে বিশ্ব জনমতের চাপের মুখে পাকিসত্মানের সেনা শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিসত্মানের কারাগার থেকে মুক্তিদিতে বাধ্য হয়।

 

তথ্যসূত্র

এম এ তাহের

যুদ্ধকালীন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার

কমান্ডার

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল

কমলনগর, লক্ষ্মীপুর।